সাভারে সবাই এমপি হতে চাইলে নেতা হবেন কে?

জাহিন সিংহ, সাভার থেকে: ভারে ভারে সাভার এখন ভারাক্লান্ত। বিশেষ করে শাসক দলে। ছোট তরী। কিন্তু যাত্রী অনেক। প্রকৃত নেতা কেউ হতে চান না। হবার প্রয়োজন-ও মনে করেন না। সবাই এখন এমপি হতে চান।তাদের ধারণা এমপি হলেই বোধহয় অটো নেতা হওয়া যায়! এই তালিকায় সর্বশেষ নাম লেখালেন,লে.কর্নেল (অব:) কানিজ ফাতেমা সুলতানা।

সাভারে আওয়ামী লীগের টিকেট পুনরায় পেতে চান চলতি সাংসদ ডা.এনামুর রহমান। মনোনয়ন প্রাপ্তিতে দলের নজর কাড়তে বসে নেই অন্যান্যরাও।

এলাকায় না এসেই মনোনয়ন চান সাবেক সাংসদ তালুকদার মো:তৌহিদ জং মুরাদ। এলাকা চষে বেড়িয়ে মনোনয়ন চান যুবলীগের বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হাসান তুহিন। শো-ডাউন করে মনোনয়ন চান যুবলীগের রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু নাসিম মো:পাভেল। পোষ্টারে পোষ্টারে মনোনয়ন চান তেতুঁলঝোড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফকরুল আলম সমর, সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা দৌলা।

সর্বশেষ বাসায় সাংবাদিক ডেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় নাম লেখালেন,লে.কর্নেল (অব:) কানিজ ফাতেমা সুলতানা।

মনোনয়ন চাওয়া সকলেরই অধিকার। দলের হয়ে এমপির টিকেট চাওয়াটাকেই অনেকে মনে করেন যোগ্যতার স্বীকৃতি। আবার অনেকে জনসেবার বিস্তৃত বাড়াতেও এমপি হতে চান। এমপি থেকে মন্ত্রী হয়ে ইতিহাসেও ঠাঁই পেতে চান অনেকে।

কিন্তু সাভারের ইতিহাস বলে অন্য কথা। আমরা বলতে চাই সে কথাই। আচ্ছা আপনারাই বলুন তো- দু একজন বাদে প্রকৃতপক্ষে কতজনের সম্পর্ক আছে সাভারের মাটি ও মানুষের সাথে।কোন এলাকায় সেতু লাগবে। কোন এলাকার বিদ্যালয় ভবন জরাজীর্ণ তার কতটুকু হিসেব আছে তাদের কাছে?

কোন এলাকার মানুষের ঘরে চাকরি প্রয়োজন। অর্থের অভাবে কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না,চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কোন এলাকায় রাস্তার বেহাল দশা- সে খবরই বা ক’জন বলতে পারবেন।

ইদানিং দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিক নামধারীদের অনেকেই আসেন ফেসবুক লাইভে। পূর্ব ঘোষণা দিয়েও অনেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে ফেসবুক লাইভে আসেন। অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখি। হতাশ হই। প্রশ্ন জাগে মনে,আপনি লাইভ করেন ভালোকথা। তবে সাংবাদিক পরিচয়ে না দিয়ে চাটুকার হিসেবে করলেই বরং ভালো। পেশাটার অন্তত অবমাননা হয় না।

সেদিন এক সাংবাদিককে বলতে শুনলাম,অমুক নেতা আমাকেও ডেকেছিলো তাকে নিয়ে ফেসবুকে লাইভে আসার জন্য। না গিয়ে দুই হাজার টাকা মিস করেছেন- এমন আফসোস-ও শুনলাম তার মুখে।

আসলে আফসোস তার নয়,আফসোস সাংবাদিক সমাজের।কারণ সাংবাদিক যখন চাটুকার হয়ে যান,তখন আর তিনি সাংবাদিক থাকেন না।

ফেসবুকে লাইভ করেন ভালো কথা। কিন্তু কখনো তো দেখি না মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীকে সাভারের জনগনের আশা আকাঙ্খা নিয়ে প্রশ্ন করতে। কখনো তো দেখি না নেতাদের জনগনের জন্যে অতীত অর্জন নিয়ে প্রশ্ন করতে।

তাবেদারী আর দালালীর লাইভ শেষে সাংবাদিক বেচারা দুই চার আনা পেলেও এসব ফালতু জিনিস দেখতে দেখতে সাভারবাসীর ইন্টারনেটের এমবিগুলোই অপচয় হয় মাত্র।

একাদশ নির্বাচনের আর বেশী দেরী নেই।একেবারেই সন্নিকটে। আগামী ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। জল্পনা রয়েছে, সম্ভাব্য ভোট গ্রহণ হতে পারে ২০,২২ অথবা ২৩ ডিসেম্বর। সে মোতাবেক হাতে সময় অল্প। আর তাই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় নাম লেখাতে।

মনোনয়ন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই সংখ্যাটা বাড়তেই থাকতে। দলের ফর্ম কেনার জন্যেও ‘ডামি’ ক্যান্ডিডেট হিসাবে অনেকে মনোনয়ন চাইবেন। কিন্তু তারা কি একবার-ও নিজের বিবেককে অন্তত প্রশ্নটা করবেন সাভারে জনগনের জন্যে তারা কি করেছেন?

কেন জনগন তাকে ভোট দেবে?
আসলে দিন বদলেছে। বদলে যাচ্ছে মানুষের চাহিদা। মন মানসিকতাও। আগে তৃণমূল থেকে বাছাই হতো নেতৃত্ব। সেটা এখন কাগজে কলমে। অধিকন্তু ক্ষেত্রে ওপর থেকেই প্রার্থিতাই চাপিয়ে দেয়া হয়।

আগে জনসেবা করে,জনগনের সুখ,দু:খের ভাগীদার হয়েই নেতা নির্বাচিত হতো। সেই নেতৃত্বের গুণে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে যোগ্য নেতা পৌঁছে যেতেন জাতীয় সংসদে। যেমন মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ,মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক,সমাজ কল্যান মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ,পাশের উপজেলা ধামরাইতে ইউপি চেয়ারম্যান থেকে আব্দুল মালেক এখন এমপি। এমন হাজারো উদাহরণ রয়েছে।

কিন্তু এখন কেউ আর কষ্ট করতে চান না। সিড়িঁ বেয়ে নয়,সবাই লিফটে ওঠার মতো দ্রুত ওপরে উঠতে চান। ফলাফল – ধপাস করে পড়েও যান তারা।

সাভারে শাসক দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ছড়াছড়ি। সে হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপিতে একক প্রার্থী। যেটা বলছিলাম,সাভারে এখন সবাই মনোনয়ন চান। ভাবখানা এমন – যেন চাইলেই পাওয়া যায়। এখন নেতা হওয়া খুবই সহজ। ডিজিটাল নেতায় ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ । অলি,গলি,পাড়া,মহল্লাজুড়ে কেবল নেতা আর নেতা।

ডিজিটাল ব্যানার আর ফেষ্টুনে দলীয় প্রধান আর স্থানীয় এমপির সাথে ছবি দিয়ে আধুলী,সিকি থেকে পাতি নেতা।হাফ নেতা,ফুল নেতা।এভাবে সবাই নেতা।বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক,সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দু:খ করে প্রায়শই বলেন,বাংলাদেশ যেন নেতা তৈরির উর্বর দেশ। নেতায় নেতায় ভরে গেছে দেশ।যেন ঘরের মধ্যে ঘর। মশারীর মধ্যে মশারী।

সাভার-ও ব্যতিক্রম নয়। ছিনতাইকারী থেকে,ধর্ষণকারী। চাঁদাবাজ,ঝুট সন্ত্রাসী থেকে খুনী। সবাই এখন নেতা। যতক্ষণ না অপরাধের পাল্লা ভারী হচ্ছে ততক্ষণ দাপুটে নেতা। আর ধরা পড়লে ‘বহিস্কার’ নামের এ্যালোপথি চিকিৎসা। এভাবেই চলছে । চলতেই থাকবে। আপত্তি নেই চলুক।

আপনারা সবাই প্রার্থী হন। মনোনয়ন চান। সমস্যা নেই। এর ভালো গুণ হলো নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়। তবে একটাই অনুরোধ,যে এলাকা থেকে এমপি হতে চান,মন্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখেন,অনুগ্রহ করে সেই এলাকার মাটি ও মানুষের আকাঙ্খাকে ধারণ করুন।

মানুষ আসলে কি চায়- সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। মাটি ও মানুষের সাথে নিজের সংযোগ তৈরি করুন। জনগনের পাশে থেকে তাদের সহায় হোন। তারপর মনোনয়ন চান- ফলাফল আজ না হয় কাল। কারণ জনগনের ভালোবাসা বিফলে যায় না। আর জানেনই তো- জনগনের ঘৃণাতেও কিন্তু মুখ দেখানো যায় না।